মালয়েশিয়া থেকে স্বর্ণপদক এনেছেন ইস্ট ওয়েস্টের দুই শিক্ষার্থী

অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধারকর্মীদের ঝুঁকি কমাতে তৈরি ‘ফায়ারগার্ড ওয়ান পয়েন্ট জিরো’

বাংলাদেশের শিল্পকারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় উদ্ধারকাজে নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। আগুন, ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাসের পাশাপাশি উচ্চ তাপমাত্রার কারণে অনেক সময় ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে। এমন বাস্তব সমস্যা থেকেই স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনিরাপত্তা রোবট তৈরির উদ্যোগ নেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির দুই শিক্ষার্থী রায়হানা ইসলাম ও মো. আমিনুল্লাহ।

তাঁদের তৈরি ‘ফায়ারগার্ড ওয়ান পয়েন্ট জিরো’ রোবটটি আগুন, ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস শনাক্ত করতে পারে। পাশাপাশি ৭০ মিটার দূর পর্যন্ত পানি ছুড়তে সক্ষম এই রোবট। প্রয়োজনে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও শব্দতরঙ্গও ব্যবহার করতে পারে এটি। উচ্চ তাপমাত্রার মধ্যেও কাজ করার সক্ষমতা রয়েছে রোবটটির।

এই উদ্ভাবন নিয়েই মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত অষ্টম ওয়ার্ল্ড ইনভেনশন কম্পিটিশন অ্যান্ড এক্সিবিশনে অংশ নেন তাঁরা। ১৯ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর সেগি ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় আইটি অ্যান্ড রোবোটিকস বিভাগে স্বর্ণপদক অর্জন করেছে তাঁদের দল।

যে ভাবনা থেকে রোবট তৈরি

গত এক দশকে বাংলাদেশে হাজারের বেশি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা রায়হানা ইসলামকে ভাবিয়ে তোলে। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, আগুন লাগার পর উদ্ধারকর্মীদের জন্য দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো অনেক সময় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

তখন তাঁর মনে প্রশ্ন আসে—রোবট ব্যবহার করে যদি আগুনের উৎস শনাক্ত করা যায় এবং দূর থেকে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা যায়, তাহলে কি উদ্ধারকর্মীদের ঝুঁকি কমানো সম্ভব?

সহপাঠী মো. আমিনুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয় সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কাজ।

রোবোটিকস ও অটোমেশনের প্রতি আগ্রহ থেকেই দুজনের এই পথচলা। আমিনুল্লাহ ছোটবেলা থেকেই রোবোটিকসের সঙ্গে যুক্ত এবং ঢাকা সিটি কলেজ সায়েন্স ক্লাবের সাবেক সভাপতি। দুজনের লক্ষ্য ছিল অটোমেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাস্তব কোনো বড় সমস্যার সমাধান করা।

এই লক্ষ্য থেকেই তাঁরা গড়ে তোলেন ‘ইনফারনোটিকস’ নামে একটি স্টার্টআপ এবং যুক্ত হন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির রোবোটিকস ক্লাবে। তাঁদের কাজে উৎসাহ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের ডিন অধ্যাপক আহমেদ ওয়াসিফ রেজাও।

সেন্সর, ডেটা আর নানা বাধা

‘ফায়ারগার্ড ওয়ান পয়েন্ট জিরো’ তৈরির পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল থার্মাল ইমেজিং, গ্যাস সেন্সিং এবং স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা একসঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা।

কখনো সেন্সর সঠিক তথ্য দিচ্ছিল না, কখনো পাওয়া যাচ্ছিল ভুল ডেটা। আবার কখনো প্রত্যাশামতো কাজ করছিল না পুরো সিস্টেম। তারপরও থেমে যাননি তাঁরা।

ক্লাস, পরীক্ষা ও অ্যাসাইনমেন্টের ব্যস্ততার মধ্যেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ল্যাবে সময় দিয়েছেন। রায়হানার মূল আগ্রহ অটোমেশনে, আর আমিনুল্লাহর দক্ষতা হার্ডওয়্যার ও ইলেকট্রনিকসে। দুজনের এই দক্ষতার সমন্বয়েই ধীরে ধীরে তৈরি হয় রোবটটির পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে ২২৫ উদ্ভাবনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা

সেগি ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের ২২৫টি উদ্ভাবন প্রদর্শিত হয়। বিভিন্ন দেশের তরুণ উদ্ভাবকের কাজ কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান রায়হানা ও আমিনুল্লাহ।

বিশেষভাবে তাঁদের নজর কাড়ে ‘স্মার্ট সিপিআর-ড্রোন ফর ইএমএস’ প্রকল্পটি। এই প্রকল্প দেখে অটোমেশন প্রযুক্তি কীভাবে সরাসরি মানুষের জীবন রক্ষায় কাজে লাগতে পারে, সে বিষয়ে নতুন ধারণা পান তাঁরা।

নিজেদের বুথেও দর্শনার্থীদের সামনে রোবটটির শব্দতরঙ্গ ব্যবহারের সক্ষমতার লাইভ ডেমো দেখান দুই শিক্ষার্থী। তাঁদের কাছে রোবটটির কার্যপ্রণালি ও প্রযুক্তিগত বিভিন্ন দিক নিয়ে জানতে চান দর্শনার্থীরা।

এরপর বিচারকদের সামনে আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তাঁরা জানতে চান, রোবটটি কীভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ করবে, উচ্চ তাপমাত্রার মধ্যেও কীভাবে কাজ করবে এবং প্রতিকূল পরিবেশে এর কার্যকারিতা কতটা থাকবে।

আমিনুল্লাহ বলেন, ‘আমরা দুজন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই এসব কারিগরি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি।’

শেষ পর্যন্ত আসে কাঙ্ক্ষিত ঘোষণা। আইটি অ্যান্ড রোবোটিকস বিভাগে স্বর্ণপদক অর্জন করে ‘ফায়ারগার্ড ওয়ান পয়েন্ট জিরো’। পুরস্কার নিতে মঞ্চে ওঠার সময় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাও সঙ্গে রাখেন দুই তরুণ উদ্ভাবক।

ফায়ারগার্ড ওয়ান পয়েন্ট জিরো

সামনে আরও বড় লক্ষ্য

স্বর্ণপদক অর্জন করলেও এখানেই থামতে চান না রায়হানা ও আমিনুল্লাহ। তাঁদের লক্ষ্য এখন রোবটটির পরবর্তী সংস্করণকে আরও উন্নত করা।

বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আরও বাড়াতে চান তাঁরা, যাতে চরম প্রতিকূল পরিবেশেও রেডিও সিগন্যাল ছাড়াই রোবটটি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।

বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানা, কেমিক্যাল প্ল্যান্ট ও পাওয়ার স্টেশনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে রোবটটির বাস্তব ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়েও ভাবছেন তাঁরা। পাশাপাশি ‘ইনফারনোটিকস’-এর মাধ্যমে এই সেফটি রোবট বাজারে আনার স্বপ্ন রয়েছে তাঁদের।

তাঁদের স্বপ্ন—একদিন দেশের কোনো কারখানায় আগুন লাগলে মানুষের আগে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাবে ‘ফায়ারগার্ড ওয়ান পয়েন্ট জিরো’। অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন রক্ষা করে শিল্পকারখানায় অগ্নিকাণ্ডজনিত মৃত্যুর হার শূন্যে নামিয়ে আনাই এখন তাঁদের লক্ষ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *