বিদেশি কর্মী নিয়োগে কোটা জালিয়াতি: মালয়েশিয়ায় ১১ বাংলাদেশিসহ আটক ২০
মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের কোটা জালিয়াতি ও মানবপাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে ১১ বাংলাদেশিসহ ২০ জনকে আটক করেছে দেশটির অভিবাসন বিভাগ (JIM)। উদ্ধার হয়েছে ২৬৫টি পাসপোর্ট।
মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী সরবরাহের কোটা নিয়ে বড় ধরনের প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে ১১ জন বাংলাদেশিসহ মোট ২০ জনকে আটক করেছে দেশটির অভিবাসন বিভাগ (জেআইএম)। বৃহস্পতিবার দেশটির তামান দাতুক আহমাদ রাজালি এলাকায় এক বিশেষ যৌথ অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। আটক ব্যক্তিদের বয়স ২৩ থেকে ৪৭ বছরের মধ্যে।
মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবান এক বিজ্ঞপ্তিতে জানান, সকাল সাড়ে সাতটার দিকে অভিযানটি শুরু করা হয়। পুত্রজায়ায় অবস্থিত অভিবাসন সদর দপ্তরের ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড স্পেশাল অপারেশনস ডিভিশন এবং ইনল্যান্ড রেভিনিউ বোর্ডের (আইআরবি) দুটি ইউনিট যৌথভাবে এ অভিযান সফল করে। সাধারণ মানুষের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং অভিবাসন বিভাগের দীর্ঘদিনের নিজস্ব গোয়েন্দা নজরদারির ওপর ভিত্তি করেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মালিক ও গ্রাহকসহ ২০ জন গ্রেপ্তার
অভিযানের বিস্তারিত জানিয়ে দাতুক জাকারিয়া শাবান বলেন, “আটককৃতদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি পুরুষ রয়েছেন, যাঁরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে ছিলেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত ৬ জন স্থানীয় মালয়েশীয় নারী কর্মী এবং ১২ জন বিদেশি গ্রাহক ছিলেন। এই গ্রাহকদের মধ্যে ৯ জন বাংলাদেশি পুরুষ ও ৩ জন ইন্দোনেশীয় নারী রয়েছেন।”
বিপুল পরিমাণ পাসপোর্ট ও নগদ অর্থ উদ্ধার
অভিযান পরিচালনাকারী দলটি তল্লাশি চালিয়ে বিভিন্ন দেশের মোট ৩৪১টি পাসপোর্ট জব্দ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- ২৬৫টি বাংলাদেশি পাসপোর্ট
- ৬৩টি ইন্দোনেশীয় পাসপোর্ট
- ১২টি পাকিস্তানি পাসপোর্ট
- ১টি ভারতীয় পাসপোর্ট
পাসপোর্টের পাশাপাশি নগদ ৬ হাজার ৭০০ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত জব্দ করা হয়েছে, যা ভুক্তভোগী গ্রাহকদের কাছ থেকে অবৈধভাবে নেওয়া অর্থ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চক্রটির কৌশল: ‘এ-টু-বি’ ফ্রড মেথড
প্রাথমিক তদন্তের তথ্যে অভিবাসন মহাপরিচালক জানান, চক্রটি কর্মী স্থানান্তরে মূলত ‘এ-টু-বি’ (A-to-B) নামের এক বিশেষ ফাঁদ ব্যবহার করত।
- এই কৌশলে প্রথমে একটি ভুয়া বা নামকাওয়াস্তে কোম্পানি (নিয়োগকর্তা ‘এ’) সরকারের কাছ থেকে কর্মী আনার অনুমোদন নিত এবং অস্থায়ী কর্মসংস্থান পাসের (PLKS) অধীনে কর্মীদের মালয়েশিয়ায় নিয়ে আসত।
- কর্মীরা পৌঁছানোর পর তাদের মূল কোম্পানিতে নিয়োগ না দিয়ে বাড়তি লাভের বিনিময়ে তৃতীয় কোনো প্রতিষ্ঠানে (নিয়োগকর্তা ‘বি’) বেআইনিভাবে সরবরাহ করা হতো।
- কোটা অনুমোদনের জন্য সিন্ডিকেটটি সরকারের কাছে একাধিক প্রতিষ্ঠানের ভুয়া কাগজপত্র ও তথ্য উপস্থাপন করেছিল।
কোটি টাকার মুনাফা ও কর ফাঁকি
পরবর্তী অনুসন্ধানে জানা গেছে, কর্মীদের বৈধ কাগজপত্রের প্রলোভন দেখিয়ে এই চক্রটি জনপ্রতি প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৫ হাজার রিঙ্গিত পর্যন্ত অবৈধ মুনাফা হাতিয়ে নিত।
শুধু তাই নয়, রাজস্ব বা কর ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রকৃত আয়ের চেয়ে অনেক কম অর্থ খাতায় দেখাত। এমনকি ২০২০ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিজেদের ব্যক্তিগত আয়ের কোনো হিসাব বিবরণীও তারা সরকারের কাছে জমা দেয়নি।
মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবান কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যারা বিদেশি কর্মী কোটার অপব্যবহার করে শ্রমিকদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে এবং অবৈধ মুনাফা অর্জন করছে, তাদের বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন বিভাগের কঠোর আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
