উপকূলীয় অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার: কেন বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যু?

Spread the love

উপকূলীয় অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার এখন এক চরম উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে, যা পূর্বে কেবল রাজধানী ঢাকা কিংবা বিভাগীয় শহরগুলোর একক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবেই বিবেচিত হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরিচিত দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেছে; দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে উপচে পড়া রোগীর ভিড় এবং মাঠপর্যায়ের নানা গবেষণায় এটি স্পষ্ট যে ডেঙ্গু এখন আর শুধু নগরের রোগ নয়, বরং জলবায়ুগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকাগুলোতেও এর একটি শক্ত ঘাঁটি তৈরি হয়েছে।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি মৌসুমে দেশে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট ডেঙ্গু রোগীর প্রায় ৪০ শতাংশই উপকূলের ১৯টি জেলার। উপকূলের প্রায় প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই এখন ডেঙ্গু ওয়ার্ডে জায়গা পেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। একদিকে সুপেয় পানির সংকট মেটাতে পাত্রে পানি জমিয়ে রাখার প্রবণতা, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার দ্রুত ত্বরান্বিত হচ্ছে। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের এই স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় এখন থেকেই বিশেষ নজরদারি ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উপকূলের হাসপাতালে উপচে পড়া ভিড়

বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উদাহরণটি উপকূলের সামগ্রিক সংকটের একটি ছোট প্রতিচ্ছবি মাত্র। ৫০ শয্যার এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বর্তমানে সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। চলতি বছর কেবল একটি উপজেলা হাসপাতালেই শত শত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন, যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।

চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর পরিসংখ্যান দেখে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। কারণ উপকূলের প্রান্তিক এলাকার বহু রোগী যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সচেতনতার অভাবে হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা নেন। ফলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা নথিবদ্ধ তথ্যের তুলনায় বহুগুণ বেশি। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে আমাদের ওয়েবসাইটের স্বাস্থ্য বিষয়ক সর্বশেষ আপডেট ও পরামর্শ নিয়মিত পড়তে পারেন।

মোট রোগীর প্রায় ৪০ শতাংশই ১৯ জেলার


সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট ডেঙ্গু রোগীর একটি বড় অংশ এখন উপকূলের ১৯টি জেলার। এর মধ্যে কক্সবাজার, বাগেরহাট, বরগুনা, বরিশাল, ভোলা, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, ফেনী, গোপালগঞ্জ, যশোর, ঝালকাঠি, খুলনা, লক্ষ্মীপুর, নড়াইল, নোয়াখালী, পিরোজপুর, সাতক্ষীরা, শরীয়তপুর ও পটুয়াখালী অন্যতম।

চলতি বছরের মধ্য অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর প্রায় ৩৯ দশমিক ৬ শতাংশই ছিল এই উপকূলীয় এলাকার। বিগত বছরগুলোতে যেখানে উপকূলের অংশ ছিল ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে, সেখানে এবার তা প্রায় ৪০ শতাংশে ঠেকেছে। একইভাবে সারা দেশে ডেঙ্গুতে যত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, তার এক-তৃতীয়াংশের বেশি মৃত্যু রেকর্ড হয়েছে উপকূলের হাসপাতালগুলোতে। রাজধানী ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য এসে যারা মারা যাচ্ছেন, তাদের হিসাব যোগ করলে এই মৃত্যুর হার আরও বাড়বে। এ সম্পর্কিত জরুরি গাইডলাইন জানতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ডেঙ্গু প্রতিরোধ নির্দেশিকা দেখতে পারেন।

উপকূলীয় অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার বৃদ্ধির ৪টি মূল কারণ

উপকূলের প্রতিকূল ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বাস্তবতা এডিস মশার বংশবিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে। গবেষক ও কীটতত্ত্ববিদরা যে ৪টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন:

  1. সুপেয় পানির সংকট ও পাত্রে পানি সংরক্ষণ: উপকূলে মিষ্টি পানির তীব্র অভাব রয়েছে। গভীর নলকূপের অপ্রতুলতা ও লবণাক্ততার কারণে স্থানীয় মানুষ বৃষ্টির পানি কিংবা দূর থেকে আনা মিষ্টি পানি বড় বড় ড্রাম, পাত্র বা জারে দীর্ঘদিন জমিয়ে রাখেন। এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য এই স্বচ্ছ, স্থির পানি সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
  2. নতুন সংক্রমণস্থল (ভার্জিন এরিয়া): রোগতত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ভাইরাসের বিস্তার চলার পর সেটি ধীরে ধীরে নতুন অনুকূল পরিবেশের দিকে ধাবিত হয়। উপকূল ডেঙ্গু ভাইরাসের জন্য অপেক্ষাকৃত নতুন অঞ্চল হওয়ায় এখানকার মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম কাজ করছে।
  3. প্রাকৃতিক আধারে মশার প্রজনন: সরকারি জরিপে দেখা গেছে, উপকূলীয় এলাকার সুপারিগাছের কাণ্ড, নারকেলের মালা, গাছের কোটর ও স্থানীয় নার্সারিগুলোতে বিপুল পরিমাণ এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে।
  4. পর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব ও জলাবদ্ধতা: উপকূলীয় পৌরসভা ও ইউনিয়নগুলোতে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতার ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার বহুগুণ বাড়ছে।

অ্যালবোপিকটাস মশার রহস্য ও নতুন উদ্বেগ

সাধারণত ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য প্রধানত দায়ী থাকে ‘এডিস ইজিপ্টাই’ প্রজাতির মশা। বিশ্বজুড়ে ধারণা করা হয়, ইজিপ্টাই মশার মাধ্যমেই প্রায় ৯৫ শতাংশ ডেঙ্গু ছড়ায় এবং ‘এডিস অ্যালবোপিকটাস’-এর ভূমিকা থাকে মাত্র ৫ শতাংশ।

তবে বরগুনা ও পিরোজপুরের মতো উপকূলীয় জেলাগুলোতে চালানো সরকারি লার্ভা জরিপে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। সেখানে এডিস অ্যালবোপিকটাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে অর্ধেকেরও বেশি (প্রায় ৫৮ শতাংশ)। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের আবহাওয়ায় অ্যালবোপিকটাসও হয়তো বিপুল মাত্রায় ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী হয়ে উঠছে। এই বিষয়ে মাঠপর্যায়ে আরও গভীর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশেষ নজরদারির ঘাটতি ও করণীয়

উপকূলীয় এলাকাগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমনিতেই নাজুক। তার ওপর ডেঙ্গুর মতো প্রাণঘাতী রোগের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব সেখানকার স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে তীব্র চাপে ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সারা দেশে সাধারণ মশক নিধন কার্যক্রম চললেও উপকূলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করে কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এখনও সেভাবে গড়ে ওঠেনি।

উপকূলীয় অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার:

  • গৃহস্থালির সংরক্ষিত পানির পাত্রগুলো প্রতি তিন দিন পর পর পরিষ্কার করা এবং সবসময় ঢেকে রাখা।
  • সুপারি বাগান, নার্সারি ও উন্মুক্ত স্থানের প্রাকৃতিক আধারগুলোতে নিয়মিত কীটনাশক প্রয়োগ।
  • উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন ও রক্তের প্লাটিলেট ব্যবস্থাপনার সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি রাখা।
  • উপকূলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা।

উপকূলের মানুষ জলবায়ু সংকটের পাশাপাশি এখন স্বাস্থ্যঝুঁকির এক বড় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সামনের দিনগুলোতে এই সংক্রমণ আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে।

One thought on “উপকূলীয় অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার: কেন বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যু?”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *