বর্তমান সংসদ পাঁচ বছর টিকবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র সংশয় প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। দেশের সামগ্রিক সংকট, আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি এবং জনগণের ভোটাধিকারের অবমূল্যায়নের প্রেক্ষাপটে বর্তমান সংসদীয় কাঠামোর স্থায়িত্ব নিয়ে এ বড় প্রশ্ন তুললেন তিনি।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় আয়োজিত এক রাজনৈতিক পথসভা ও প্রচারপত্র বিলি কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার কোনো প্রতিফলন ঘটছে না।
জনগণের আস্থার সংকট ও সংসদের কার্যকারিতা
দীর্ঘ দেড় দশক পর দেশে যে সংসদ গঠিত হয়েছে, তাকে ঘিরে সাধারণ মানুষের যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি বলে মনে করছে বিরোধী শিবির। যাত্রাবাড়ীতে আয়োজিত পথসভায় নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন, সংসদে যদি বিরোধী কণ্ঠ ও সাধারণ মানুষের অধিকারের সুরক্ষা না থাকে, তবে সেই আইনসভার গণতান্ত্রিক মূল্য হারিয়ে যায়।
তিনি অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে দলীয়করণের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তাতে সাধারণ নাগরিকেরা দিশেহারা। বিরোধী দলের কোনো যৌক্তিক দাবি সংসদে গুরুত্ব পাচ্ছে না।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির অবস্থান (অভ্যন্তরীণ লিংক যুক্ত করার স্থান)
বর্তমান সংসদ পাঁচ বছর টিকবে কি না: নাহিদ ইসলামের মূল্যায়ন
বক্তব্যের মূল অংশে নাহিদ ইসলাম সরাসরি প্রশ্ন তোলেন সংসদীয় স্থায়িত্ব নিয়ে। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, বর্তমান সংসদ পাঁচ বছর টিকবে কি না, সে বিষয়ে খোদ রাজনৈতিক মহলেই গুরুতর সন্দেহ রয়েছে। তাঁর মতে, ১৬ বছর পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এই আইনসভার কার্যকর কোনো ক্ষমতা বা জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা অবশিষ্ট নেই।
তিনি মন্তব্য করেন, “যেখানে জনগণের কণ্ঠস্বরের কোনো দাম নেই, সেখানে সংসদের মূল্য আর দুই আনাও থাকে না।” জনপ্রতিনিধিত্বহীন সিদ্ধান্ত চলতে থাকলে এই সংসদ তার পূর্ণ মেয়াদকাল পার করতে পারবে কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রবল অনীহা ও সংশয় তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও প্রশাসকদের ভূমিকা নিয়ে আপত্তি
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েও কড়া অবস্থান তুলে ধরেন এনসিপি আহ্বায়ক। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসককে আগামী নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। নাহিদ ইসলাম এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং অনতিবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি করেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা অনির্বাচিত বা অন্তর্বর্তী প্রশাসকরা যদি নিজেরাই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তবে সেটি কোন ধরনের গণতান্ত্রিক চর্চা? সিটি করপোরেশন, পৌরসভা কিংবা জেলা পরিষদে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকদের নির্বাচনী সুবিধা নেওয়া পুরোপুরি অনৈতিক। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কোনো প্রশাসককে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না।
আইনশৃঙ্খলা ও জ্বালানি খাতে দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি
দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকারের নীতিগত ব্যর্থতার কঠোর সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ। তিনি সরকারকে দুটি বিষয়ে অবিলম্বে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান:
- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ: সারা দেশে আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান অবনতি রোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়িত্বে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, বিদ্যমান নেতৃত্বের অধীনে সাধারণ নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ফেরানো অসম্ভব।
- জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ: অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সাধারণ মানুষের ওপর জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দুর্ভোগ সৃষ্টির দায় নিয়ে জ্বালানিমন্ত্রীকেও অবিলম্বে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়।
দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও সংসদীয় রেওয়াজ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (IPU)-এর প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশিকা দেখতে পারেন।
সংবিধান সংস্কার ও ৩০ অক্টোবরের গণবিক্ষোভ কর্মসূচি
নাহিদ ইসলাম বর্তমান সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে বলেন, কমিটির নামে যা চলছে তা কেবলই একটি নাটক। জনগণ তথাকথিত সংস্কার কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং একটি কার্যকর ও সার্বজনীন ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের জোর দাবি জানাচ্ছে।
এসব দাবির সপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে আগামী ৩০ অক্টোবর রাজধানীর শাহবাগে এক বিশাল গণবিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা। যাত্রাবাড়ীর পাশাপাশি দলটির পক্ষ থেকে উত্তরার বিভিন্ন পয়েন্টেও ব্যাপক গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ করা হয়।
- যাত্রাবাড়ী কর্মসূচিতে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে এনসিপির ঘোষিত মেয়রপ্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য আলী আহসান জুনায়েদ এবং সদস্যসচিব এস এম শাহরিয়া।
- উত্তরা কর্মসূচিতে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ: জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ও সারোয়ার তুষার।
উপসংহার
নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য দেশের রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে। জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি এবং স্থানীয় সরকার নিয়ে বিতর্ক যখন তুঙ্গে, তখন বিরোধী দলগুলোর এমন কঠোর অবস্থান ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। দিনশেষে, সামগ্রিক সংকটের টেকসই সমাধান এবং জনআস্থার সংকট কাটাতে না পারলে বর্তমান সংসদ পাঁচ বছর টিকবে কি না, সেই অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।