কিম জং–উনের বিলাসী জীবন: ওয়ানসানে ৪টি গোপন প্রমোদতরির চাঞ্চল্যকর তথ্য

Spread the love

কিম জং–উনের বিলাসী জীবন সাধারণ উত্তর কোরীয়দের চরম দারিদ্র্যপীড়িত বাস্তবতার চেয়ে কতটা ভিন্ন, তা আরেকবার স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে সাম্প্রতিক কিছু স্যাটেলাইট চিত্র। যেখানে দেশটির সাধারণ মানুষ নিত্যদিনের খাবার ও বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদ জোগাড় করতে প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন, সেখানে সর্বোচ্চ নেতার অবকাশযাপনে যুক্ত হয়েছে একের পর এক রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা। ওয়ানসান উপকূলের কালমা উপদ্বীপে নোঙর করা সুবিশাল প্রমোদতরিগুলো শাসকগোষ্ঠীর এই চরম বৈপরীত্যকে নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় এনেছে।

কিম জং–উনের বিলাসী জীবন ও ওয়ানসান উপকূলের রহস্যময় নৌযান

উত্তর কোরিয়ার ওয়ানসান উপকূলের স্বচ্ছ জলসীমায় সম্প্রতি কৃত্রিম উপগ্রহের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে এক চোখধাঁধানো দৃশ্য। গত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কালমা উপদ্বীপের কাছে নোঙর করা অবস্থায় দেখা গেছে দৈর্ঘ্যে প্রায় ৮০ মিটার বা ২৬৩ ফুট দীর্ঘ এক সুবিশাল প্রমোদতরি। দীর্ঘদিন মেরামতের জন্য একটি ডকইয়ার্ডে ফেলে রাখার পর গ্রীষ্মের শুরুতে এটি ওয়ানসানের বিশেষ জলসীমায় নামিয়ে আনা হয়।

সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, এই বিশাল জলযানের ডেকে রয়েছে প্রায় ৫০ মিটার দীর্ঘ একটি নিজস্ব সুইমিংপুল। শুধু তা-ই নয়, পুলটির এক প্রান্তে বিনোদনের জন্য বসানো হয়েছে আধুনিক ওয়াটার স্লাইড। এই নৌযানের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিস্তারিত প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে অত্যন্ত গোপনে এবং কড়া রাষ্ট্রীয় পাহারায় এই নৌযানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।

কিম জং–উনের বিলাসী জীবন ও তাঁর রাজকীয় নৌবহর

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

কিম জং–উনের বিলাসী জীবন কেবল একটি মাত্র জাহাজে সীমাবদ্ধ নয়। উপগ্রহের তথ্য বিশ্লেষণে ওয়ানসানে কিমের ব্যক্তিগত প্রাসাদের আশপাশে মোট চারটি বড় আকারের নৌযানের নিয়মিত উপস্থিতি শনাক্ত করা গেছে:

  • ৮০ মিটারের মেগা-ইয়ট: ব্যক্তিগত ওয়াটার পার্ক ও ৫০ মিটারের সুইমিংপুলসমৃদ্ধ প্রধান নৌযান।
  • ৬০ মিটারের বিলাসবহুল ক্রুজ: অতিথিদের আপ্যায়ন, বিনোদন ও দীর্ঘ জলভ্রমণে ব্যবহৃত সুবিশাল জাহাজ।
  • ৫০ ও ৫৫ মিটারের দুটি দ্রুতগামী নৌযান: ব্যক্তিগত দ্বীপগুলো পরিদর্শন ও গোপন যাতায়াতের কাজে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মানের একেকটি প্রমোদতরির আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য কয়েক কোটি থেকে ১০ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে। ক্ষমতাসীন দলের বৈদেশিক তহবিল ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, কিম জং–উনের বিলাসী জীবন বজায় রাখতে শীতকালে জাহাজগুলো গোপন রাখা হলেও গ্রীষ্মের শুরুতেই পরিবারের বিনোদনের জন্য সাগরে নামানো হয়। ছোট ছোট কিছু সহযোগী বোট সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করে মূল জাহাজে প্রয়োজনীয় জ্বালানি, রসদ ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

সাধারণ মানুষের অনাহার বনাম কিম জং–উনের বিলাসী জীবন

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার সাধারণ নাগরিকদের জীবন চরম দারিদ্র্যের শৃঙ্খলে বন্দি।

বিষয়উত্তর কোরিয়াদক্ষিণ কোরিয়া
মাথাপিছু জিডিপিআনুমানিক $৬৬৭ \vert{} প্রায় $৩৬,২২৭
অপুষ্টির হারপ্রায় ৪০%৫%-এর নিচে
ভ্রমণ স্বাধীনতাসম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিতউন্মুক্ত

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার প্রায় ৪০ শতাংশ নাগরিক দীর্ঘস্থায়ী খাদ্যসংকট ও তীব্র অপুষ্টির শিকার। দীর্ঘকাল ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা এবং বাজেটের সিংহভাগ সামরিক কর্মসূচিতে ব্যয়ের ফলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। কর্মক্ষেত্রে অমানুষিক পরিশ্রম করেও নাগরিকরা বছরে নির্ধারিত ১৪ দিনের ছুটি বাস্তবে ভোগ করতে পারেন না। নিজের জেলা পরিবর্তনের জন্যও সরকারের বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে বিনোদন বা ছুটি কাটানো যেখানে অসম্ভব, সেখানে কিম জং–উনের বিলাসী জীবন এক চরম বৈপরীত্য তৈরি করেছে।

কিম জং উন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ওয়ানসানের সাথে কিম পরিবারের ঐতিহাসিক যোগসূত্র

ওয়ানসান শহরটির সঙ্গে কিম রাজবংশের সম্পর্ক বহু পুরোনো। কিম জং–উন তাঁর শৈশবের একটি বড় অংশ মায়ের সঙ্গে এই সমুদ্রতীরবর্তী শহরেই কাটিয়েছেন। অতীতে সাবেক মার্কিন বাস্কেটবল তারকা ডেনিস রডম্যানও জানিয়েছিলেন, তিনি কিম পরিবারের সঙ্গে ওয়ানসানের ব্যক্তিগত জলসীমায় জেট স্কি চালিয়েছেন এবং প্রায় ৬০ মিটার দীর্ঘ বিলাসবহুল এক প্রমোদতরিতে সময় কাটিয়েছেন।

স্যাটেলাইট বিশ্লেষকরা লক্ষ্য করেছেন, সর্বোচ্চ নেতা যখন দীর্ঘ সময় পিয়ংইয়ংয়ের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের আড়ালে থাকেন কিংবা প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেন না, ঠিক তখনই ওয়ানসানে তাঁর প্রমোদতরিগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে।

কালমা প্রকল্প: জনসাধারণের অবকাশ নাকি প্রদর্শনীর কৌশল?

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। ছবি: রয়টার্স

কালমা অবকাশকেন্দ্রে বর্তমানে রুশ ও কিছু আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। প্রচার করা হচ্ছে এটি সাধারণ স্থানীয় নাগরিকদের জন্যও উন্মুক্ত।

তবে অভ্যন্তরীণ বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য সেখানে মাত্র চার রাতের প্যাকেজ মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ১০০ ডলার, যা তাদের গড় মাসিক উপার্জনের কয়েক গুণ। ফলে সাধারণ পর্যটকের উপস্থিতি সেখানে নেই বললেই চলে। প্রকৃতপক্ষে, রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রে সর্বোচ্চ নেতাকে সর্বদা একজন আত্মত্যাগী ও জনগণের সেবক হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, ওয়ানসানের সৈকতে ভাসমান শতকোটি টাকার মেগা-ইয়টগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে কিম জং–উনের বিলাসী জীবন সাধারণ নাগরিকদের বাস্তবতার চেয়ে শত আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করে। সাগরের বুকে গড়ে তোলা এই ব্যক্তিগত বিনোদনকেন্দ্র শাসকের চরম রাজকীয় আড়ম্বরের এক বাস্তব প্রমাণ।



আপনার জন্য আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ খবর: রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আইন কার্যকরের আগেই স্থগিত করলেন ট্রাম্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *