জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির ৭টি মারাত্মক ধোঁকাবাজি: এনসিপি

Spread the love

অক্ষরে অক্ষরে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় এলেও বিএনপি বাস্তবে জনগণের সঙ্গে চূড়ান্ত ধোঁকাবাজি ও রাজনৈতিক প্রতারণা করছে বলে তীব্র অভিযোগ তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

দলটির শীর্ষ নেতারা দাবি করেছেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক অগ্রযাত্রাকে পরিকল্পিতভাবে পেছনে টেনে নেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে বর্তমান সরকার। মূলত একচ্ছত্র ও জবাবদিহিহীন ক্ষমতা ভোগের মানসিকতা থেকেই সরকার মৌলিক সংস্কার কার্যক্রম থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে।

আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ স্বাক্ষরের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে সনদের এক বছরের মূল্যায়ন, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।

জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে এনসিপির ৭টি প্রধান অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা বিএনপির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ৭টি বড় অভিযোগ ও ধোঁকাবাজির দিক তুলে ধরেন:

১. সংস্কার পিছিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত: রক্তের বিনিময়ে দেশ সংস্কারের যে পরিপক্ব স্তরে পৌঁছেছিল, সরকার সেই অর্জনগুলোকে পেছনে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

২. গণভোটের রায় অমান্য: গণভোটের স্পষ্ট নির্দেশনা ও রায়কে উপেক্ষা করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেওয়া থেকে বিরত থাকা।

৩. একচ্ছত্র ক্ষমতার অপব্যবহার: প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এড়িয়ে একচ্ছত্র ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পরিচালনা করার মানসিকতা লালন করা।

৪. সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বাতিল: জুলাই সনদে একমত থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতায় এসে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতীক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বাতিল করা।

৫. স্থায়ী কমিটির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ: সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি পদে বিরোধী দলকে সংখ্যানুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার লিখিত অঙ্গীকার পদদলিত করা।

৬. একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি: জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেটকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সম্পূর্ণ একদলীয় কমিটি গঠন করা, যা সংস্কার ভেস্তে দেওয়ার শামিল।

৭. আওয়ামী কাঠামোর ধারাবাহিকতা: মুখে জুলাই সনদের কথা বললেও অন্তরে পুরনো আওয়ামী বন্দোবস্ত টিকিয়ে রেখে আগামী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা।

জুলাই সনদ ও সংস্কারের পথ রুদ্ধ করার চক্রান্ত

সংবাদ সম্মেলনে সমাপনী বক্তব্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, দেশপ্রেমিক জনগণ রক্তের বিনিময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের যে পরিপক্ব স্তরে দেশকে পৌঁছে দিয়েছিল, বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সেই অর্জনগুলোকে বিনষ্ট করার চেষ্টা করছে।

তারা মুখে জুলাই সনদের কথা বললেও বাস্তবে কোনো মৌলিক রূপান্তর ঘটাতে আগ্রহী নয়। বরং একের পর এক টালবাহানা ও ধোঁকাবাজির মাধ্যমে তারা জুলাই সনদকে কার্যত অর্থহীন করে তুলছে।

আখতার হোসেন আরও উল্লেখ করেন, গণভোটের স্পষ্ট নির্দেশনা মেনে বিএনপি সরকার যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ করত, তবে জাতীয় সংসদে সংস্কারের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে একটি ইতিবাচক আলোচনা হতে পারত। কিন্তু সরকার সে পথে হাঁটেনি।

গণভোটের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করলেও এতে রাষ্ট্র কিংবা জনগণের কী ক্ষতি হতো—তার কোনো সদুত্তর সরকার দিতে পারেনি। যারা কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ছাড়া নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পরিচালনা করতে চায়, তাদের কাছ থেকে সংস্কারের মতো ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন আশা করা অসম্ভব।

গণভোটের রায় অগ্রাহ্য ও জুলাই সনদের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ

গণভোটের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের রায় জাতীয় সংসদও কোনোভাবে অস্বীকার করতে পারে না উল্লেখ করে এনসিপির সদস্যসচিব বলেন, সংস্কার ইস্যুতে বিএনপি প্রতিনিয়ত জাতির সঙ্গে প্রতারণামূলক আচরণ করছে। যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জুলাই সনদে বিএনপির কোনো ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) ছিল না, ক্ষমতায় আসার পর তারা সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

এর সুস্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে তিনি বিচার বিভাগের প্রসঙ্গের কথা বলেন। জুলাই সনদে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠনের ব্যাপারে সুস্পষ্ট সম্মতি থাকা সত্ত্বেও সরকার তা বাস্তবায়ন না করে বাতিল করে দিয়েছে।

পাশাপাশি, জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি পদে বিরোধী দলকে সংখ্যানুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার লিখিত অঙ্গীকারও পদদলিত করা হয়েছে। সরকার এখন অজুহাত দিচ্ছে যে বিরোধীরা সংবিধান সংশোধন কমিটিতে না আসায় এ পদ দেওয়া হয়নি, যা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও খোঁড়া যুক্তি। দেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে দৈনিক খবর-এ প্রকাশিত অন্যান্য প্রতিবেদনেও এ ধরণের চিত্র উঠে এসেছে।

একদলীয় সংশোধন কমিটি ও জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ

বর্তমান সংবিধান সংশোধন কমিটির কঠোর সমালোচনা করে আখতার হোসেন বলেন, জনগণের প্রত্যক্ষ রায় ও গণভোটের ম্যান্ডেটকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ একদলীয় ও অগণতান্ত্রিক।

এই কমিটি চলমান সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না; বরং এটি সামগ্রিক সংস্কার উদ্যোগকে নস্যাৎ করার চক্রান্ত মাত্র।

তিনি বলেন, বারবার আহ্বানের পরও জাতীয় নাগরিক পার্টি নীতিগত কারণে এই একদলীয় কমিটিতে যোগ দেয়নি। জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তিতে এনসিপির স্পষ্ট বার্তা—এই বিতর্কিত কমিটি অবিলম্বে বিলুপ্ত করে গণভোটের রায় অনুযায়ী একটি প্রতিনিধিত্বশীল ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করতে হবে।

‘বিএনপির মুখে জুলাই সনদ, অন্তরে আওয়ামী লীগ’: সারোয়ার তুষার

সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উপপ্রধান সারোয়ার তুষার সরকারের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতেই জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে সংবিধান সংশোধন কমিটি করা হয়েছে।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিএনপির মুখে জুলাই সনদের বুলি থাকলেও অন্তরে এখনো পুরনো আওয়ামী কাঠামো টিকিয়ে রাখার মানসিকতা বিরাজ করছে।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিএনপি মূলত একটি দুর্বল বিকল্প হিসেবে আওয়ামী শাসনব্যবস্থাকেই জিইয়ে রাখতে চায়, যাতে তারা আগামী সাধারণ নির্বাচনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে প্রভাবিত (ম্যানিপুলেট) করতে পারে। এই অসৎ উদ্দেশ্যের কারণেই তারা জুলাই সনদের শর্তগুলো বাস্তবায়নে ভয় পাচ্ছে।

গণভোটের রায় ও জুলাই সনদের অঙ্গীকার যদি অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা না হয়, তবে নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলন অচিরেই তীব্র গণ-আন্দোলনে রূপ নেবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সালেহউদ্দিন সিফাত। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন এবং যুগ্ম সদস্যসচিব ফরিদুল হকসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *