রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আইন কার্যকরের আগেই স্থগিত করলেন ট্রাম্প

Spread the love

রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ও নতুন বাণিজ্য শুল্ক কার্যকর হওয়ার মাত্র এক দিন আগেই তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত মাসে নিজ হাতে এই সংক্রান্ত কঠোর বিলে স্বাক্ষর করার পর হঠাৎ তাঁর এমন সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক চাঞ্চল্যের জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয় সময় শুক্রবার হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত এক বিশেষ নির্বাহী আদেশে এই স্থগিতাদেশ জারি করা হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার লক্ষ্যেই রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের এই জরুরি সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।

রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের কারণ ও পটভূমি

গত মাসে পাস হওয়া বিতর্কিত আইনে রাশিয়ার পণ্যের ওপর সরাসরি বাড়তি শুল্ক আরোপের কঠোর বিধান রাখা হয়েছিল। একইসঙ্গে যেসব দেশ রুশ অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস কেনা অব্যাহত রাখবে, তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল।

আইনের ধারা অনুযায়ী, রাশিয়ার জ্বালানির শীর্ষ পাঁচ আমদানিকারক দেশের পণ্যে সর্বোচ্চ শতভাগ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ পায় মার্কিন প্রশাসন। মূলত ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মস্কোর যুদ্ধ পরিচালনার অর্থনৈতিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের এই আইন মার্কিন কংগ্রেসে পাস করা হয়েছিল।

তবে ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে ক্রেমলিনের প্রতি কিছুটা নমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করছেন। অন্যদিকে, তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির তীব্র সমালোচনা করে আসছেন এবং কিয়েভে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের দাবি তুলেছেন।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও মার্কিন অর্থনীতি

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ও অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে অনেক বেড়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি দেখা দিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে এমনিতেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারে বড় ধরনের চাপ বিরাজ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ভোক্তারা ইতোমধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অতিরিক্ত গ্যাসোলিনের দামের কারণে চাপের মুখে রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে রাশিয়ার তেল সরবরাহ আকস্মিকভাবে বাধাগ্রস্ত হলে মার্কিন পাম্পগুলোতে তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারত।

সামনেই যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে তুমুল লড়াই করছে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি। এই সংবেদনশীল সময়ে তেলের বাড়তি দাম সাধারণ ভোটারদের ক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে। তাই অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ এড়াতে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখা হয়েছে।

জ্বালানি চুক্তি ও কূটনৈতিক কৌশল

জ্বালানির বাজার স্থিতিশীল রাখতে কিছুদিন আগেই রাশিয়ার সঙ্গে বিশেষ ডিজেল সরবরাহ সংক্রান্ত চুক্তিতে জড়িয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া বিশ্ববাজারে প্রয়োজনীয় ডিজেল সরবরাহ করতে সম্মত হয়, যার বিনিময়ে ট্রাম্প প্রশাসন রুশ জ্বালানি রপ্তানির বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করে।

বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের ধারণা, অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি ঠেকিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই এই স্থগিতাদেশের প্রধান উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসন একদিকে নিজের দেশের অর্থনীতি সুরক্ষিত করল, অন্যদিকে মস্কোর সাথে আলোচনার একটি পরোক্ষ পথও উন্মুক্ত রাখল।

রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এই আকস্মিক নীতিবদল ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দেশের চলমান আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক নানা বিশ্লেষণ দৈনিক খবর-এর আন্তর্জাতিক পাতায় গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হচ্ছে।

রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ও ডেমোক্র্যাটদের ক্ষোভ

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শীর্ষ নেতারা। ভার্জিনিয়ার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ডন বেয়ার সরাসরি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের চাপের কাছে মাথানত করছেন।

এক ক্ষুব্ধ বিবৃতিতে তিনি বলেন, পুতিনের সামনে ট্রাম্পের এই পিছু হটা মূলত ইউক্রেনীয় মিত্রদের সঙ্গে এক ধরণের সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা। রাশিয়ার আগ্রাসনের শাস্তি নিশ্চিত করতে যে আইন পাস হয়েছিল, ট্রাম্প তাঁর একতরফা আদেশে তা ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন।

শুধু বিরোধীরাই নন, রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে থাকা কট্টরপন্থী অনেক আইনপ্রণেতাও রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা এভাবে স্থগিত করায় চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে এই আইনের মূল পৃষ্ঠপোষক প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের ঘনিষ্ঠ সমর্থকেরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন আধিপত্য ও বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হলো।

স্থগিতাদেশের ভবিষ্যৎ প্রভাব

হোয়াইট হাউসের নির্বাহী আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট নিজে অথবা তাঁর নিযুক্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা পরবর্তী কোনো নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে। এর ফলে মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পুরো উদ্যোগটি এখন অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে গেল।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো ভবিষ্যতে মস্কোকে আলোচনার টেবিলে আনতে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের এই কৌশলকে বড় রাজনৈতিক সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করবে।

সব মিলিয়ে, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখার এই কৌশল মার্কিন ভোক্তাদের সাময়িক স্বস্তি দিলেও আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ও হোয়াইট হাউসের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করছে এই স্থগিতাদেশের ভবিষ্যৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *