সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এক বড় সুখবর এসেছে। চলতি অক্টোবর মাসের বেতন থেকেই সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বর্ধিত হারে মূল বেতন পেতে শুরু করবেন। তবে নতুন পে স্কেল অনুযায়ী মূল বেতন এ মাস থেকেই অ্যাকাউন্টে যোগ হলেও বিভিন্ন ভাতার ক্ষেত্রে এখনই পরিবর্তন আসছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে জারি করা এক জরুরি প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, পরবর্তী সরকারি নির্দেশনা জারি না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের ভাতা পূর্বের নির্ধারিত হারেই চালু থাকবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত এই বিশেষ আদেশ সরকারের সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধীনস্থ অধিদপ্তর, সরকারি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সরাসরি কার্যকর হবে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মধ্যে বেতন বৃদ্ধি নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে গেছে।
ভাতা কার্যকরে কেন পূর্বের হার বজায় থাকছে?
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ও ভাতাদি আদেশে যে নতুন মূল বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে, তা পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে ভাতা নিয়ে কিছুটা আইনি ও প্রযুক্তিগত সমন্বয় প্রয়োজন। ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত যে হারে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রচলিত ভাতা দেওয়া হতো, নতুন নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত শতকরা হিসাবে ঠিক সেই হারেই তা বণ্টন করা হবে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সরকার গত ১৯ সেপ্টেম্বর নতুন বেতন ও ভাতাদির আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশ করেছিল। তখনই নীতিগতভাবে জানানো হয়েছিল যে, জাতীয় বাজেটের সার্বিক ভারসাম্য রক্ষা এবং ধাপে ধাপে আর্থিক চাপ সামাল দেওয়ার সুবিধার্থে ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি মূল বেতন কার্যকরের পরবর্তী ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
কোন ধাপে কত বেতন: নতুন পে স্কেলের বিস্তারিত রূপরেখা
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের জন্য মূল বেতন চূড়ান্ত করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এই বর্ধিত বেতন কাঠামোটি মূলত ২০২৬–২৭ এবং ২০২৭–২৮—এই দুই অর্থবছরের মধ্যে তিনটি ভিন্ন ধাপে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করার রোডম্যাপ চূড়ান্ত করেছে অর্থ বিভাগ।
বেতন বাস্তবায়নের এই তিনটি পর্যায় নিচে তুলে ধরা হলো:
- প্রথম ধাপ: চলতি ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত বেতনের প্রথম পর্যায়ের সুবিধা কার্যকর থাকবে।
- দ্বিতীয় ধাপ: ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ৩০ জুন পর্যন্ত দ্বিতীয় পর্যায়ের ধাপে মূল বেতনের সমন্বয় ঘটবে।
- তৃতীয় ধাপ: ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তৃতীয় ধাপ বাস্তবায়িত হবে।
- ভাতার পূর্ণ বাস্তবায়ন: নতুন স্কেলের সাথে সামঞ্জস্য রেখে পূর্ণাঙ্গ বর্ধিত ভাতা চালু হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
আইবাস প্লাস প্লাসে (iBAS++) পে ফিক্সেশনের অগ্রগতি
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য মাঠপর্যায়ে তথ্য অন্তর্ভুক্তির মূল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে সরকারের স্বয়ংক্রিয় আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ‘আইবাস প্লাস প্লাস’ (iBAS++)। গত ৫ অক্টোবর থেকে সরকারি কর্মচারীরা অনলাইনে এই সিস্টেমের ‘পে ফিক্সেশন’ অপশনে প্রবেশ করে প্রয়োজনীয় তথ্য ও জাতীয় পরিচয়পত্রের বিবরণ যাচাই করে নিচ্ছেন।
প্রযুক্তিগত এই তথ্য হালনাগাদের সময়সীমা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ডিজিটাল এই পদ্ধতির কারণে কোনো ধরনের মধ্যবর্তী জটিলতা ছাড়াই কর্মচারীদের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (EFT) মাধ্যমে সঠিক অংকের বর্ধিত মূল বেতন সরাসরি পৌঁছে যাবে।
বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও অর্থনৈতিক প্রভাব
অর্থ বিভাগ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, চলতি মাস শেষেই বর্ধিত স্কেলের অর্থ পরিশোধের জন্য জাতীয় বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ফলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন উত্তোলনে কোনো ধরনের আর্থিক টানাপোড়েন বা প্রশাসনিক বিলম্বের সুযোগ নেই।
বাজারের ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির এই সময়ে মূল বেতন কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারি চাকুরিজীবীদের পরিবারে সাময়িক আর্থিক স্বস্তি ফিরবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। যদিও পূর্ণাঙ্গ ভাতা পেতে কর্মচারীদের আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে, তবে মূল স্কেল এ মাস থেকেই একাউন্টে যুক্ত হওয়াকে বড় প্রাপ্তি হিসেবেই দেখছেন সবাই।
জাতীয় অর্থনীতি, সরকারি পরিপত্র ও দেশের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ খবর পড়তে নিয়মিত আমাদের বাংলাদেশ ক্যাটাগরিতে ভিজিট করতে পারেন। এছাড়া সরকারি পে ফিক্সেশন সংক্রান্ত যেকোনো টেকনিক্যাল নির্দেশিকা জানতে ভিজিট করতে পারেন বাংলাদেশ সরকারের অর্থ বিভাগ (Finance Division) পোর্টালে।