শশী থারুর অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক দাবিকে কোনোভাবেই বাংলাদেশ কিংবা ফ্রান্সের রক্তাক্ত সহিংসতার সঙ্গে তুলনা করা চলে না। ভারতের প্রধান বিরোধী দলগুলোর উদ্দেশ্য কোনো অনির্বাচিত উপায়ে সরকার ফেলে দেওয়া নয়, বরং একটি নিরপেক্ষ, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা। সোমবার গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে কংগ্রেসের এই শীর্ষ সাংসদ কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দলের তোলা ‘সহিংস ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেন।
সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দাবি করেন যে, বাংলাদেশ ও ফ্রান্সে ঘটে যাওয়া অস্থিরতার মতো ভারতেও তরুণ প্রজন্মকে উসকে দিয়ে সরকার পতনের এক গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। রিজিজুর এই মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শশী থারুর স্পষ্ট যুক্তি তুলে ধরেন এবং জানান যে গণতন্ত্রে অধিকার আদায়ের লড়াই আর অরাজকতা এক জিনিস নয়।
অন্য দেশের সহিংসতার সঙ্গে ভারতের তুলনা কেন অযৌক্তিক?
ভারতের বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শশী থারুর বলেন, “আমার স্পষ্ট বক্তব্য হলো—ভারত বাংলাদেশ নয়, আর ভারত ফ্রান্সও নয়। এই দুই দেশের পরিস্থিতির সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক প্রতিবাদের তুলনা টানা সম্পূর্ণ অমূলক ও অযৌক্তিক।”
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে ফ্রান্সে বাস পোড়ানো, থানায় হামলা বা জনসাধারণের সম্পত্তি ধ্বংসের মতো চরমপন্থাকে ভারতীয় বিরোধীরা কখনোই সমর্থন করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না। ভারতে বিরোধী দলগুলো সর্বদাই মহাত্মা গান্ধীর প্রদর্শিত অহিংস ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ধারায় বিশ্বাসী। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে তিনি নিজেও এমন অহিংস আন্দোলনের অংশীদার হয়েছেন। তাই বিরোধীদের ‘সরকার ফেলে দেওয়ার চেষ্টা’ হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টাকে তিনি সরকারের রাজনৈতিক বিকৃতি বলে অভিহিত করেন।
নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা
বিরোধী দলগুলোর চলমান আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শশী থারুর ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থার গুরুতর কিছু অসঙ্গতির দিকে আলোকপাত করেন। তিনি অভিযোগ করেন, অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ, অনিয়মিত এবং বহুলাংশে বেআইনি এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্প্রতি ভোটার তালিকা থেকে দেশের বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বেমালুম বাদ দেওয়া হয়েছে।
কংগ্রেস নেতার ভাষায়, “নাগরিকদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার এই বেআইনি পদক্ষেপ বাতিল চেয়ে আমরা রাজপথে নেমেছি। এটি সম্পূর্ণ একটি সাংবিধানিক দাবি, কোনো অগণতান্ত্রিক সরকার পতনের পায়তারা নয়।” তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন:
- ভারতের গণতন্ত্র কারও ব্যক্তিগত দয়া বা উপহার নয়।
- দেশের প্রতিটি সাধারণ নাগরিকই এই সংবিধান ও গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী।
- নির্বাচন কমিশনের অস্তিত্ব নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, তবে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পক্ষপাতদুষ্ট ও ত্রুটিপূর্ণ কাজের ধরন নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
‘সরকার বদল’ বিতর্ক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা
মূলত বিজেপি নেতা কিরেন রিজিজুর বক্তব্যের পরই এই উত্তাপের সূচনা হয়। তিনি অভিযোগ তোলেন যে ভারতবিরোধী শক্তি ও কিছু স্বার্থান্বেষী রাজনীতিবিদ যৌথভাবে রাস্তায় নেমে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে।
এর সাথে বিতর্কের আগুনে ঘি ঢালে প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের একটি বক্তব্য, যেখানে তিনি বর্তমান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে চলা জনবিক্ষোভকে ‘সরকার বদলের মহালড়াই’ আখ্যা দেন। অন্যদিকে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (AISA) সভাপতি নেহা বোরা বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের উদাহরণ টেনে বক্তব্য দিলে কেন্দ্র একে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রচার শুরু করে। এসবের বিরুদ্ধেই সাংবিধানিক ভারসাম্যের যুক্তি তুলে ধরেন শশী থারুর।
ইলন মাস্কের স্টারলিংক বনাম আম্বানি বিতর্ক
রাজনৈতিক উত্তেজনার বাইরে ইলন মাস্কের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা ‘স্টারলিংক’ প্রসঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ মত প্রকাশ করেন এই দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। ভারতে স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের অনুমোদন ও স্পেকট্রাম বরাদ্দ নিয়ে ইলন মাস্ক ও মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্সের প্রতিযোগিতা সম্পর্কে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে সরকার যে অবস্থান নিয়েছে তা আপাতদৃষ্টিতে ভারসাম্যপূর্ণ।
তিনি উল্লেখ করেন যে এই প্রযুক্তি চালুর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, স্যাটেলাইটের আপলিংকিং সুবিধা, কারিগরি সক্ষমতা এবং শেষ পর্যন্ত গ্রাহক পর্যায়ের খরচের বিষয়টি গভীরভাবে জড়িত। মাস্কের স্টারলিংক কিংবা আম্বানির জিও—কার সেবা কতটা সাশ্রয়ী ও কার্যকর হবে, সেই চূড়ান্ত রায় সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত বলে তিনি মত দেন।
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ
একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশ্ন তোলা ও সুষ্ঠু ভোটাধিকার দাবি করা কোনো অপরাধ বা রাষ্ট্রদ্রোহ নয়—এই বার্তাই পুরো বক্তব্যে জোর দিয়ে তুলে ধরেন এই শীর্ষ নেতা। তিনি বিশ্বাস করেন, ভারতের মতো সুবিশাল ও ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রে রাজপথের বিশৃঙ্খলা নয়, বরং ব্যালট বাক্সের মাধ্যমেই কেবল সরকার নির্ধারণ হওয়া উচিত।
ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও উপমহাদেশের সর্বশেষ অর্থনৈতিক কূটনীতি নিয়ে আরও বিশ্লেষণ পড়তে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের আন্তর্জাতিক সংবাদ বিভাগে। এছাড়া ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশিকা ও ভোটার সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করতে ভিজিট করতে পারেন ভারতের অফিসিয়াল Election Commission of India (ECI) পোর্টালে।
বিশ্বের আরও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পড়তে ভিজিট করুন এখানে>>