দাভোস ইন দ্য ডেজার্ট শেষ পর্যন্ত তীব্র নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে চলতি বছরের মতো স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি ও সৌদি আরবের অর্থনীতির জন্য এক বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে। মূলত প্রতিবেশী ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের একের পর এক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ও ড্রোন হামলার চরম আশঙ্কার কারণেই আয়োজকেরা এই মেগা আয়োজনটি বাতিল করে আগামী বছর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে সৌদি আরবের বার্ষিক ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এফআইআই বা FII) সম্মেলনটি ‘মরুভূমির দাভোস’ বা দাভোস ইন দ্য ডেজার্ট নামেই সর্বাধিক পরিচিত। চলতি অক্টোবর মাসের শেষভাগে বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রভাবশালী রাষ্ট্রনেতা, বাণিজ্যমন্ত্রী, শীর্ষস্থানীয় ধনকুবের এবং বহুজাতিক করপোরেট নির্বাহীদের উপস্থিতিতে রাজধানী রিয়াদে এটি রাজকীয় মর্যাদায় আয়োজনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তে ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে সেই মহাযজ্ঞ স্থগিত করতে হলো।
কেন হঠাৎ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিল আয়োজক কর্তৃপক্ষ?
সম্মেলনের মূল আয়োজক সংস্থা এফআইআই ইনস্টিটিউটের (FII Institute) অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর যে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তা আপাতত হচ্ছে না।
আয়োজক কমিটি প্রথমে আন্তর্জাতিক অতিথিদের জন্য সরাসরি উপস্থিতির বদলে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা করেছিল। তবে বৈশ্বিক নির্বাহীদের সশরীরে অংশগ্রহণ ও বাস্তবভিত্তিক আলোচনার গুরুত্ব বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত পুরো অনুষ্ঠানটিই এক বছরের জন্য স্থগিত করার চূড়ান্ত রায় আসে।
এফআইআই ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাহা বিনতে মিশারি আল সৌদ এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানান, এই সিদ্ধান্তটি তাদের অংশীদার, সদস্য, বিশ্বমানের আমন্ত্রিত বক্তা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের প্রতি তাদের দায়িত্বশীলতা ও গভীর অঙ্গীকারেরই বহিঃপ্রকাশ। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এবারের আয়োজনটি ছিল তাদের ঐতিহাসিক দশম বিশেষ আসর। তাই কোনো ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি বা অপূর্ণতা নিয়ে আয়োজন না করে, আন্তর্জাতিক কমিউনিটির প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি স্মরণীয়, পূর্ণাঙ্গ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতেই তারা এই সাময়িক বিরতি বেছে নিয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আগামী বছর ঠিক কবে নাগাদ এই আয়োজন করা হবে, তার সম্ভাব্য তারিখ দ্রুত জানিয়ে দেওয়া হবে।
হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে হুতি বিদ্রোহীদের আক্রমণাত্মক তৎপরতা চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। রাজধানী রিয়াদসহ দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোকে নিশানা করে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে বিদেশি কূটনীতিক, করপোরেট বস ও বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশটিতে ভ্রমণ করা নিয়ে এক নজিরবিহীন নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে।
ইয়েমেনে দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থনে সামরিক লড়াই চালিয়ে আসছে সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী। এর প্রতিক্রিয়ায় ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতিরা সৌদি আরবের তেল শোধনাগার, জাতীয় বিমানবন্দর এবং স্পর্শকাতর অর্থনৈতিক স্থাপনায় প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়ে আসছে। আঞ্চলিক সংঘাত ও লোহিত সাগরের বর্তমান উত্তেজনার কারণেই এ বছর ঐতিহ্যবাহী দাভোস ইন দ্য ডেজার্ট আয়োজন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
‘দাভোস ইন দ্য ডেজার্ট’ কী এবং কেন এটি সৌদি অর্থনীতির প্রাণ?
সুইজারল্যান্ডের দাভোস শহরে প্রতিবছর বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (World Economic Forum) যে ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, সেই মর্যাদাপূর্ণ কাঠামোর অনুকরণে সৌদি আরবের রিয়াদের সম্মেলনকে আন্তর্জাতিক মিডিয়া ‘মরুভূমির দাভোস’ বা দাভোস ইন দ্য ডেজার্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘোষিত ঐতিহাসিক মহাপরিকল্পনা ‘ভিশন ২০৩০’-এর কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি বলা হয় এই সম্মেলনকে। সৌদি আরবের এই মেগা উদ্যোগের পেছনে মূলত তিনটি লক্ষ্য কাজ করছে:
- তেল নির্ভরতা হ্রাস: কেবল অপরিশোধিত খনিজ তেল ও গ্যাসের ওপর একক নির্ভরতা থেকে অর্থনীতিকে বের করে এনে বহুমাত্রিক শিল্পায়ন গড়ে তোলা।
- বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ: পর্যটন, আধুনিক বিনোদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), উচ্চপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ক্রীড়া খাতে বিপুল পরিমাণ প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) নিশ্চিত করা।
- আঞ্চলিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র: মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবসা পরিচালনার জন্য বিশ্বখ্যাত বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর আঞ্চলিক সদর দপ্তর রিয়াদে স্থানান্তর করতে উৎসাহিত করা।
শীর্ষ আন্তর্জাতিক নির্বাহীদের সফর বাতিল ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
স্থগিত হওয়া এবারের দশম আসরে যোগ দেওয়ার কথা ছিল বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি ও আর্থিক জায়ান্টদের প্রধানদের। নিশ্চিত অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় ছিলেন অ্যালফাবেট ও গুগলের প্রেসিডেন্ট রুথ পোরাট, বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও ডেভিড সলোমন এবং ব্ল্যাকরকের প্রধান নির্বাহী লরেন্স ফিঙ্ক।
বিশ্বখ্যাত এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের নির্ধারিত সফর ও উপস্থিতি বাতিল হওয়ার কারণে কেবল বর্তমান আয়োজনই ধাক্কা খেল না, বরং আগামী কয়েক বছরের জন্য পরিকল্পিত শত শত চুক্তির স্বাক্ষরও অনিশ্চয়তায় পড়ল। এতে সৌদি আরবের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ কার্যক্রমে তাৎক্ষণিকভাবে একটি স্থবিরতা তৈরি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কূটনীতি ও বিনিয়োগের বাস্তবতা
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের অভিমত, দাভোস ইন দ্য ডেজার্ট পিছিয়ে যাওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি ভুল বার্তা পৌঁছাতে পারে যে, সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এখনও শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত নয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বড় অংকের দীর্ঘমেয়াদি মূলধন খাটাতে বিদেশি কোম্পানিগুলো কিছুটা দ্বিধায় পড়তে পারে।
তবে আয়োজকদের জোরালো আশা, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ থেকে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের মেঘ দূর হলে আগামী বছর আরও বহুগুণ উৎসাহ ও নতুন শক্তি নিয়ে এই অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মটি পুনরুজ্জীবিত হবে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও অর্থনৈতিক খবরের সর্বশেষ তথ্য যাচাই করতে নিয়মিত চোখ রাখতে পারেন আন্তর্জাতিক সংবাদ বিভাগে। এছাড়া সম্মেলনসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য পেতে ভিজিট করতে পারেন FII Institute Portal-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট।
বিশ্বের আরও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পড়তে ভিজিট করুন এখানে>>