লিবারেশন ডকফেস্ট বাংলাদেশ আবারও মুখরিত করতে আসছে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মন। ঢাকার বুকে শুরু হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত আন্তর্জাতিক প্রামাণ্য চলচ্চিত্র উৎসব ‘লিবারেশন ডকফেস্ট বাংলাদেশ’-এর ১৩তম আসর। সেলুলয়েডের পর্দায় মানুষের মুক্তি, ন্যায়বিচার, প্রতিবাদ এবং বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের সত্য গল্প তুলে ধরতে এই আন্তর্জাতিক মঞ্চের গুরুত্ব অপরিসীম।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আগামী ২৯ অক্টোবর জমকালো উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠবে তিন দিনব্যাপী এ উৎসবের। উৎসবটি চলবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে জমা পড়া অসংখ্য সৃষ্টির ভিড় থেকে অত্যন্ত কঠোর ও নিরপেক্ষ বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে ১৭টি দুর্দান্ত প্রামাণ্যচিত্র।
এবারের প্রতিপাদ্য: ‘প্রেজেন্স ইন অ্যাবসেন্স’
শিল্প ও প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে অনুপস্থিতির মধ্যেও গভীর সত্যের উপস্থিতিকে অনুধাবন করার আহ্বান নিয়ে এবারের আসরের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘প্রেজেন্স ইন অ্যাবসেন্স’ (Presence in Absence)। দৃশ্যমান বাস্তবতার আড়ালে হারিয়ে যাওয়া মানুষ, চাপা পড়া ইতিহাস এবং প্রান্তিক মানুষের অব্যক্ত বেদনার অস্তিত্ব খুঁজে বের করাই এই থিমের মূল লক্ষ্য।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আয়োজক কমিটি জানিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ ও বৈশ্বিক মানবাধিকারের ওপর নির্মিত চলচ্চিত্রচর্চার বিস্তার ঘটানোই এই উৎসবের প্রধান লক্ষ্য। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নির্মাতাদের সাথে বাংলাদেশের উদীয়মান স্বাধীন নির্মাতাদের সংযোগ তৈরি এবং তরুণ প্রজন্মকে নন-ফিকশন বা তথ্যচিত্র নির্মাণে উৎসাহিত করতে এ আয়োজন বিশেষ ভূমিকা রাখবে। তরুণ সমাজের সরাসরি সম্পৃক্ততা ও নেতৃত্বের বিকাশ বাড়াতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ জন শিক্ষার্থীকে ভলান্টিয়ার বা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে, যারা উৎসবের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত থাকবেন।
১৮৮টি চলচ্চিত্র থেকে যেভাবে বাছাই হলো ১৭টি শ্রেষ্ঠ কাজ
বিশ্বের নানা দেশ থেকে চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাদের শ্রম ও সৃজনশীলতায় গড়া প্রামাণ্যচিত্র এই উৎসবে পাঠিয়েছিলেন। জমা পড়া মোট ১৮৮টি প্রামাণ্যচিত্র থেকে প্রতিটি ফ্রেম, অডিও ও বর্ণনার শক্তি পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই শেষে প্রদর্শনীর জন্য মাত্র ১৭টি চলচ্চিত্র চূড়ান্ত করে আট সদস্যের বিজ্ঞ প্রিভিউ কমিটি।
উক্ত প্রিভিউ কমিটিতে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন:
- জিহান করিম
- বিপ্লব সরকার
- মেহেদী মোস্তফা
- পার্থ সারথী
- শারমিন দোজা
- চৈতালী সমাদ্দার
- কামরুল আহসান
- কাজী আরেফিন আহমেদ
কমিটির দীর্ঘ চুলচেরা মূল্যায়নের পর নির্বাচিত চলচ্চিত্রগুলোকে বিষয়ভিত্তিক একাধিক তাৎপর্যপূর্ণ ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি বিভাগ বাস্তব জীবনের ভিন্ন ভিন্ন সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের সংকট তুলে ধরে:
- বডিজ অ্যান্ড বিলংগিং: মানুষের শরীর, অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের গভীর অন্বেষণ।
- জেন্ডার ইকুয়ালিটি অ্যান্ড রেজিস্ট্যান্স: লিঙ্গ সমতা প্রতিষ্ঠা এবং নারীর অধিকার আদায়ের অবিচল সংগ্রাম।
- রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড রিফর্ম: অন্যায় কাঠামোর বিরুদ্ধে নাগরিক প্রতিরোধ ও সমাজ সংস্কারের প্রয়াস।
- জেনারেশনাল মেমোরি: প্রজন্মের স্মৃতি, পারিবারিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা।
- ডিসপ্লেসমেন্ট অ্যান্ড স্টেটলেসনেস: বাস্তুচ্যুতি, শরণার্থী সংকট ও রাষ্ট্রহীন মানুষের করুণ বাস্তবতা।
- ১৯৭১: লিভিং আর্কাইভস: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও জীবন্ত স্মৃতিচিহ্ন।
- ইকোলজি ইন ক্রাইসিস: জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম আঘাত ও পরিবেশগত বিপর্যয়।
- অ্যানচেস্ট্রাল রুটস অ্যান্ড লাইভলিহুডস: পূর্বপুরুষের শেকড়, লোকসংস্কৃতি ও বেঁচে থাকার জীবনসংগ্রাম।
পুরস্কার ও বিচারকমণ্ডলী: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা
এবারের লিবারেশন ডকফেস্ট বাংলাদেশ উৎসবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক—উভয় প্রতিযোগিতা বিভাগেই রয়েছে আকর্ষণীয় স্বীকৃতি ও পুরস্কার। প্রতিটি বিভাগে শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্যচিত্রের জন্য থাকছে এক লাখ টাকার আর্থিক সম্মাননা। এর পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টি ও মূল্যবোধ থেকে সবচেয়ে অর্থবহ কাজটি বেছে নেওয়ার জন্য গঠন করা হয়েছে নয় সদস্যের একটি বিশেষ ‘ইয়ুথ জুরি কমিটি’। সবজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে সম্মাননা স্মারক ক্রেস্ট ও আনুষ্ঠানিক সনদপত্র।
জাতীয় প্রতিযোগিতা বিভাগের জুরি সদস্য:
- প্রখ্যাত প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা শবনম ফেরদৌসী
- বিশিষ্ট দৃশ্যশিল্পী ও নির্মাতা দিলারা বেগম
- ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের শিক্ষক সাজ্জাদ হোসেন
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বিভাগের জুরি সদস্য:
- বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও নাট্যজন ম. হামিদ
- বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা ও গবেষক শামীম আখতার
- মানবাধিকারকর্মী ও লেখক আসিফ মুনীর
তরুণ নির্মাতাদের জন্য বিশেষ সেমিনার
কেবল প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর মধ্যেই এই উৎসব সীমাবদ্ধ নয়; বরং ঐতিহাসিক সচেতনতা ও অ্যাকাডেমিক গবেষণার মেলবন্ধন ঘটাতে উৎসবের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ৩০ অক্টোবর বিকেল ৪টায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সেমিনারকক্ষে একটি উন্মুক্ত সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে।
সেমিনারের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়—‘উচ্চশিক্ষায় শ্রেণিকক্ষের অ্যাসাইনমেন্ট হিসেবে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা’। এ সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকদের পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে কীভাবে মানবিক ও গবেষণাধর্মী তথ্যচিত্র নির্মাণে আগ্রহী করে তোলা যায়, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কার্যকর দিকনির্দেশনা শেয়ার করবেন।
লিবারেশন ডকফেস্ট বাংলাদেশ-এর ঐতিহ্য ও প্রভাব
বিশ্বব্যাপী শোষিত মানুষের মুক্তি এবং মানবাধিকার রক্ষার সুমহান সংগ্রামকে রূপালি পর্দায় তুলে ধরার দূরদর্শী লক্ষ্য নিয়ে ২০০৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছিল লিবারেশন ডকফেস্ট বাংলাদেশ। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই প্ল্যাটফর্মটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দায়িত্বশীল ও প্রভাবশালী প্রামাণ্যচিত্র উৎসব হিসেবে নিজস্ব অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং বাস্তব দলিল উপস্থাপনের এক নিরাপদ ক্ষেত্র হিসেবে এটি দেশে-বিদেশে প্রশংসিত।
যারা মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক সচেতনতা এবং বাস্তবধর্মী বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র ভালোবাসেন, ২৯ থেকে ৩১ অক্টোবর প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক অসাধারণ অনুপ্রেরণাদায়ী অভিজ্ঞতা।
বিনোদন জগতের আরো সংবাদ পড়তে চোখ রাখুন এখানে>>