দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল হতে এবং বিদ্যমান জ্বালানি সংকট কাটিয়ে উঠতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাৎক্ষণিক কোনো অবাস্তব আশ্বাস না দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, সময়োপযোগী সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে সরকারের সুনির্দিষ্ট পাঁচ বছরের একটি সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা রয়েছে।
রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংক্রান্ত এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি শীর্ষ পর্যায়ের বিনিয়োগকারী, অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা উপস্থিত ছিলেন।
দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল করার বাস্তবসম্মত রূপরেখা
জনগণকে ভুল আশ্বাস দেওয়ার কোনো পক্ষপাতী নন জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, রাতারাতি সব জটিল সংকট উধাও হয়ে যাবে—এমন চটকদার প্রতিশ্রুতি বাস্তবতা বিবর্জিত। সরকারের বর্তমান রোডম্যাপ অনুযায়ী:
- প্রথম দুই বছর: জরুরি কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে বর্তমান সংকট দূর করা হবে এবং দ্রুত দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা হবে।
- তৃতীয় বছর: আর্থিক খাত ও শিল্প বাণিজ্যের স্থবিরতা কেটে গিয়ে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গতি বৃদ্ধি পাবে।
- চতুর্থ ও পঞ্চম বছর: জাতীয় অর্থনীতি তার পূর্ণ গতিতে ঘুরে দাঁড়াবে এবং টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
অর্থমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, কোনো কৃত্রিম পদক্ষেপে নয়, বরং স্থায়ী সংস্কারের মাধ্যমেই মূলত দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল করার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে। এ বিষয়ে দেশের সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য জানতে পড়ুন আমাদের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতের বিশেষ প্রতিবেদন।
জ্বালানি সংকটের মূল কারণ ও বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
বক্তব্যের শুরুতে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া তীব্র যুদ্ধপরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি করেছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত এখন আর কেবল একক কোনো খাত নয়, বরং পুরো উৎপাদনব্যবস্থা সচল রাখার প্রধান ভিত্তি।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটের প্রত্যক্ষ প্রভাব মোকাবিলা করতে হয়েছে। এর পাশাপাশি অতীতের অপরিকল্পিত নীতি এবং বিপুল পরিমাণ ঋণের বোঝাও বহন করতে হচ্ছে। তবে এসব উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া প্রতিকূলতাকে অজুহাত না বানিয়ে সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রণ হ্রাস ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পুনর্গঠন
দেশে ব্যবসা পরিচালনার খরচ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘকাল ধরে আমলাতান্ত্রিক অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে ব্যবসার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছিল। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস করাই এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ভেঙে দুটি পৃথক সংস্থায় রূপান্তর করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে একটি সংস্থা রাজস্ব সংক্রান্ত মূল পলিসি বা নীতিমালা তৈরি করবে এবং অন্য সংস্থাটি মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়ন করবে। দেশের সার্বিক আর্থিক শৃঙ্খলা ও নীতি সংক্রান্ত নির্দেশনার বিস্তারিত পাওয়া যাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিশিয়াল পোর্টালে।
গ্যাস অনুসন্ধান ও সৌরবিদ্যুতের মহাপ্রকল্প
আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোই একমাত্র পথ। অর্থমন্ত্রী জানান, গত এক থেকে দেড় দশকে দেশে কার্যকর কোনো অনুসন্ধান চালানো হয়নি। তাই নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে:
- ৫০টি নতুন কূপ খনন: রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে দিয়ে দ্রুত ৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন হয়েছে।
- অফশোর ও অনশোর অনুসন্ধান: পিএসসি (উৎপাদন বণ্টন চুক্তি) চূড়ান্ত করে স্থলভাগ ও সমুদ্র উভয় অঞ্চলেই গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
- ১০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ: পরিবেশবান্ধব বিকল্প জ্বালানি নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে ১০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
- কর ছাড়: সৌরবিদ্যুতের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানির ওপর সকল প্রকার কর প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের ক্ষত নিরাময় ও বৈশ্বিক বিনিয়োগ
ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থার চিত্র তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী জানান, দেশ থেকে প্রায় ২৩৫ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে যাওয়ার ফলে পুঁজিবাজার ও ব্যাংক খাতে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছিল। সংকট সামাল দিতে কোষাগার থেকে ইতোমধ্যে অতিরিক্ত সাত বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে।
তবে কঠোর নজরদারির মাধ্যমে ব্যাংক খাত ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক রূপ ফিরে পাচ্ছে। সম্প্রতি নিউইয়র্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ ১৬ জন আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রায় ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলার তহবিলের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের বন্ড ও ক্যাপিটাল মার্কেটে বিনিয়োগের আশ্বাস দিয়েছেন। সঠিক নীতি ও স্বচ্ছতা বজায় থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল হয়ে উঠবে।
অর্থনীতির আরো খবর পড়তে চোখ রাখুন এখানে…