বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন পাচ্ছে তল্লাশির ক্ষমতা: ৭টি বড় পরিবর্তনের খসড়া প্রকাশ

Spread the love

বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে অসাধু সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য ফিরিয়ে আনতে এবার সরাসরি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালানোর বিশেষ ক্ষমতা পেতে যাচ্ছে। পণ্যমূল্য নিয়ে অনৈতিক যোগসাজশ, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি, ছোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা থেকে উৎখাত করা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কারসাজির অকাট্য প্রমাণ সংগ্রহ করতেই এ কঠোর পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত সংশোধনী চূড়ান্ত হলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন এর কর্মকর্তারা তদন্তের স্বার্থে যেকোনো সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে গুরুত্বপূর্ণ নথি, সফটওয়্যার, কম্পিউটার এবং সার্ভারে সংরক্ষিত ডিজিটাল তথ্য সরাসরি জব্দ করতে পারবেন। বিদ্যমান ২০১২ সালের প্রতিযোগিতা আইন সংশোধন করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এই যুগান্তকারী খসড়া প্রকাশ করেছে।

কেন যুগোপযোগী হচ্ছে ২০১২ সালের প্রতিযোগিতা আইন?

বাংলাদেশে মুক্ত ও সুষ্ঠু বাণিজ্যিক পরিবেশ গড়ে তুলতে ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। এরপর এই কাঠামোর অধীনে গঠিত হয় বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। তবে আইনগত সীমাবদ্ধতা ও নির্বাহী তল্লাশির ক্ষমতা না থাকায় বিগত এক দশকে কমিশন তার পূর্ণ সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারেনি।

কমিশনের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫৪টি মামলা দায়ের করা হলেও তার রায় থেকে বাজারে তেমন দৃশ্যমান কোনো সুফল মেলেনি। কারণ হিসেবে দেখা গেছে, পর্যাপ্ত নথিপত্র ও প্রত্যক্ষ ডিজিটাল প্রমাণের ঘাটতির কারণে বেশিরভাগ মামলা উচ্চ আদালতে আটকে রয়েছে। এই আইনি দুর্বলতা কাটিয়ে প্রতিবেশি দেশগুলোর সফল আইনি কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনটি ঢেলে সাজানো হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই নতুন উদ্যোগ সংক্রান্ত বিধিমালার হালনাগাদ জানতে ভিজিট করুন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট।

অফিসে প্রবেশ ও কম্পিউটার-নথি জব্দের কঠোর বিধান

ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট বা কার্টেল সাধারণত অত্যন্ত গোপনে পরিচালিত হয়। তাই তাদের গোপন তথ্য উদঘাটনে তদন্ত কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ ক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সংশোধিত আইনের খসড়ায় যেসব ক্ষমতা রাখা হয়েছে:

  1. সরাসরি তল্লাশি অভিযান: সন্দেহজনক যেকোনো বাণিজ্যিক ভবন, দাপ্তরিক কক্ষ বা প্রতিষ্ঠানে তদন্ত দল প্রবেশ ও তল্লাশি চালাতে পারবে।
  2. ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ: তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের প্রয়োজনে হার্ডড্রাইভ, কম্পিউটার, বিশেষ সফটওয়্যার ও হিসাবের খাতা জব্দ করা যাবে।
  3. স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়া: অন্তত দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে তল্লাশি চালাতে হবে এবং পুরো কার্যক্রমটি ভিডিও বা আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে রেকর্ড করে রাখতে হবে।
  4. জব্দ তালিকার অনুলিপি: জব্দকৃত সব নথিপত্রের একটি স্বচ্ছ তালিকা প্রস্তুত করে তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

দেশের সার্বিক বাণিজ্যিক পরিবেশ ও ভোক্তা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য পেতে পড়ুন আমাদের অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিশেষ প্রতিবেদন।

সম্মিলিত আধিপত্য ও ডিজিটাল বাজারের কারসাজি দমন

বিদ্যমান আইনে মূলত কোনো একক প্রতিষ্ঠান ক্ষমতার অপব্যবহার করলে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান ছিল। তবে নতুন সংশোধনীতে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গোপনে একত্রিত হয়ে বাজারে আধিপত্য বিস্তার বা কার্টেল গড়ে তুললে তাদের বিরুদ্ধেও সম্মিলিত কঠোর শাস্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।

পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। ই-কমার্স কিংবা অ্যাপভিত্তিক ব্যবসায় গ্রাহকের তথ্য আটকে রেখে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাজারে ঢুকতে বাধা দেওয়া কিংবা কৃত্রিম অ্যালগরিদম ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে পণ্যের দাম বাড়িয়ে প্রতিযোগিতাবিরোধী পরিবেশ সৃষ্টি করলে তাও এই আইনের আওতায় মারাত্মক দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

অপরাধ স্বীকার করলে শাস্তি কমানোর বিশেষ সুযোগ

যেহেতু গোপন ব্যবসায়িক আঁতাত বা কার্টেলের লিখিত প্রমাণ পাওয়া কঠিন, তাই আন্তর্জাতিক রীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন খসড়ায় ‘শাস্তি লাঘব’ বা বিশেষ ছাড়ের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

যদি কোনো অসাধু চক্রের অংশীদার বা প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় তাদের অপরাধ স্বীকার করে এবং পুরো কার্টেলের গোপন নথি ও পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ দিয়ে কমিশনকে সহযোগিতা করে, তবে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন সেই সহযোগিতাকারীর শাস্তি কমাতে বা সম্পূর্ণ অব্যাহতি দিতে পারবে। এমনকি প্রাথমিক অভিযোগ উত্থাপনের পর লিখিতভাবে দোষ স্বীকার করলেও এই আইনি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকবে।

স্বাধীন আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন

আদালতের মামলার দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে এবং দ্রুত আইনি প্রতিকার দিতে একটি পৃথক ‘প্রতিযোগিতা আপিল ট্রাইব্যুনাল’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

  • ট্রাইব্যুনালের কাঠামো: একজন চেয়ারম্যান এবং সর্বোচ্চ দুইজন দক্ষ সদস্য নিয়ে এই ট্রাইব্যুনাল পরিচালিত হবে। চেয়ারম্যান পদে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি বা অন্তত ২০ বছরের বিচারিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হবে।
  • আপিলের সময়সীমা: কমিশনের কোনো আদেশে ক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ৩০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে পারবেন। তবে আর্থিক জরিমানার আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে জরিমানার ২৫ শতাংশ অর্থ আগেই কমিশনে জমা রাখতে হবে।
  • দ্রুত নিষ্পত্তি: ট্রাইব্যুনালকে অবশ্যই আবেদন জমা পড়ার ৯০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করতে হবে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্যমান আইনের ৩৭(২) ধারাটি বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। পূর্বের আইনে সরকারের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত বলে গণ্য করার যে বিতর্কিত বিধান ছিল, তা বিলুপ্ত করা হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন বিচারিক সংস্থা হিসেবে তার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে, যা দেশের মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সুশাসন নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *